Search
Tuesday 24 October 2017
  • :
  • :
English Version

ম্যাজিশিয়ান স্যারের গল্প

ম্যাজিশিয়ান স্যারের গল্প

Sharing is caring!

গেস্টরুম থেকেই বেডরুমের ঝগড়ার আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পেল ফারিয়া। কুৎসিত ঝগড়া। অবশ্য ঝগড়া বোধহয় সবসময় কুৎসিতই হয়। ঝগড়ার আর নান্দনিক সৌন্দর্য কী। না, তাও ঠিক না বোধহয়। শৈল্পিক ঝগড়াও আছে। ঝগড়ার সৌন্দর্যের সঙ্গে ফারিয়ার পরিচয় হয়েছিল একবার। তার বান্ধবী রূপকথার বাসায়। রূপকথার মতোই সংসার ছিল তার। বই খাতা কাপড়চোপড় সবকিছু থেকে পরিচ্ছন্নতা উপচে পড়ছে যেন। কিচেনের দেরাজগুলো তকতকে। পেছনে যত্নে বানানো কিচেন গার্ডেনের কাঁচামরিচ গাছে ঝুলে থাকে। ঘন কালো রঙের সতেজ মরিচ। গভীর লেবু রঙ পাতা বেয়ে লেবুর গন্ধ উঁকি দেয় রূপকথার ঝকঝকে কিচেনে। সেই গন্ধ শুঁকে শুঁকে সুখী রান্নাঘরে রান্না করে ‘সুখী’ রূপকথা। তার জারুল রঙের বেগুনি শাড়ির কুঁচির কোথাও একটা আলগা ভাঁজ থাকে না। সুখী শাড়ির সুন্দর আড়ালে ঝকঝকে ফর্সা গোড়ালি। তাও সুখের ইশারা দেয়। রূপকথার চুল চোখ-নাক-মুখ সবই উঁচু দরের। কফির জন্য কেটলিতে পানি গরমের সময় রূপকথার ফোলা ফোলা গালের পুতুল মেয়ে এসে আধো ভাঙা বুলিতে ছড়া কাটে, বাবল বাবল/ সেজ দ্য কেটল/ বাবল বাবল সেজ দ্য পট…। বিকালে রূপকথা তার পিয়ানিস্ট আঙুল দিয়ে আসন্ন শীত উপলক্ষে স্বামীর জন্য পুলওভার বোনে। সর-মাখনে মাখামাখি সংসার। ফারিয়ার নিজের জীবন তখন ‘যবের ছাতুদশা’। সবে চাকরি হারিয়েছে। প্রায় উন্মাদিনীর মতো চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছে। কোথাও ‘ওয়েট্রেস নিডেড’ লেখা দেখলেও সেখানে ঢুকে জানতে চায় ‘আপনারা ওয়েট্রেস চান?’ বলেই ক্ষিপ্র হাতে ব্যাগ থেকে সিভি বের করে। সম্ভাব্য ওয়েট্রেসের মুখে বাংলা আবেদন শুনে পাঁচতারা কর্তৃপক্ষের ভ্রুতে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে। তারা হয়তো আশা করেছিল আমেরিকান অ্যাকসেন্টের ইংরেজি আবেদন। তাদের হতাশ মুখ দেখে ফারিয়াও হতাশ হয়। কাউকে হতাশ করতে কারই বা ভালো লাগে। কিন্তু তার দশা এমনই যে কেউ তাকে না চাইলেও অথবা কোথাও তার দরকার না থাকলেও জোর করেই তাকে ঢুকে পড়তে হবে। শরীর এবং ক্ষুধা নামক সেই অনিবার্য প্রয়োজনের কাছে মাথা নত করতে হয় বলেই এই এনক্রোচমেন্ট।
বান্ধবী রূপকথার গোলজামগন্ধী সংসারের সুখ বোঝাবুঝির মতো অবস্থা তখন তার নাই। পারলে তখন সে ট্রেনের নিচেই ঝাঁপ দেয়। কিন্তু পেটের মধ্যে মায়ের শেখানো নীতিবিদ্যা তখনও গুজগুজ করছে- ‘জীবন সুন্দর, ইহাকে ছাড়িয়া যাইতে নাই।’ অতঃপর একবার সে নিজের দুর্দশার দিকে তাকায়, একবার আলগা আলগা চোখে দেখে রূপকথার মসৃণ সংসার। রূপকথার পায়ের নিচে ফুলের স্তূপ। ফারিয়ার পায়ের নিচে কাঁটার বোঝা। জগত সংসারের কোনো স্তরের আলাপ যে রূপকথা আর তার স্বামী পাণ্ডিত্য দিয়ে বিচার করে সেই স্তরে ঢুকতেই পারে না ফারিয়া। তার মাথার মধ্যে খালি টাকার চিন্তার বুদ্বুদ। তো ফারিয়ার চোখের সামনেই একদিন সেই ঋষি স্বামী আর ‘সংসার শিল্পী’ ফারিয়ার ডিভোর্স হয়ে গেল। মাত্র একটি বাক্য খরচ হল তার জন্য। জেব্রা যেমন ঘাস খেতে খেতে মুহূর্তের তরে মাটি থেকে দিগন্তের দিকে মুখ তুলে তাকায়। ব্যাপারটা অনেকটা তেমনই ছিল। যেন আমরা দুজনে আর একসঙ্গে থাকব না এই কথাটি বলার জন্যই পরস্পরের দিকে তাকাল তারা। আমাদের দু’জনের বোধ হয় আর একসঙ্গে থাকা উচিত নয়। ব্যস, এইটুকুনই বলল খালি। ফারিয়ার মাথাতেই ঢুকল না এই যে এত যত্ন করে গোটা ছাদ ভর্তি করে ফেলা হল অর্কিড আর ক্যাকটাসে, রূপকথা পছন্দ করে বলে, তার মধ্যে তবে কোনো ভালোবাসা ছিল না? এত রূপ নিয়ে, জীবনের এত নিখুঁত প্ল্যান নিয়ে এই শীতল সম্পর্ক তৈরি করেছে তারা? পরস্পরের চোখে দূরগামী জাহাজের স্বপ্ন। কিংবা কে জানে এমনই নিয়ম হয়তো রূপকথাদের সমাজের। সাজানো-গোছানো সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দেয়ার মধ্যেই আনন্দ। সবকিছুর ওপর নিজের ইচ্ছাকে মূল্য দেয়া। এমনকি ‘বাবল বাবল সেজ দ্য কেটল… ’ সন্তানও ইচ্ছার উপরে নয়।
যাই হোক, এখন যে ঝগড়া সে শুনছে সেটা তেমন শৈল্পিক ঝগড়া নয়। রীতিমতো অপমানজনক। অন্তত ফারিয়ার জন্য তো বটেই। ঝগড়াটা তাকে নিয়েই কীনা। আমজাদ ভাইয়ের চড়া গলা শোনা গেল। তোমার এই সিন্দাবাদের ভূত বান্ধবী কবে বিদায় হবে। ফৌজিয়ার চাপা লজ্জিত, কুণ্ঠিত স্বর-আস্তে বল, শুনতে পাবে। আমজাদ ভাই আস্তে বললেও অবশ্য সব শুনতে পেত ফারিয়া। আমজাদ ভাই নরমাল রেঞ্জের চেয়ে সবসময়ই দুই ধাপ উঁচু ভলিউমে কথা বলেন। সবই শুনতে পায় ফারিয়া। প্রত্যেক দিন তাকে নিয়ে ঝগড়া দিয়ে দিন শুরু হয় এদের। আজকে ঝগড়া আর সব দিনের চেয়ে আরেক ধাপ নগ্ন। ব্যাপারটা এমন যে আজই ফারিয়া চলে না গেলে আজকেই তাকে ঘাড় ধরে বের করে দেবেন আমজাদ ভাই। ফারিয়ার বারবার মনে হতে লাগল, হায়! মাটি কেন একটুখানি সরে তাকে খানিক জায়গা করে দেয় না। পারলে সে সেখানেই ঢুকে যায়। আশ্রিত অনুগ্রহের জীবনের চেয়ে থালা হাতে ফার্মগেটে দাঁড়িয়ে পড়া ভালো। চাকরিটা গেছে তিনমাস হল। তিন মাসেই তার হাল হয়েছে ফকিরের মতো। না, ভুল হল। ফকিরের চেয়েও নিচে। ভিক্ষুকদের ওপর একটা রিপোর্টে সে যা পড়েছিল তাতে তার অবস্থা ভিক্ষুকদেরও নিচে। অনেক ভিক্ষুকের নাকি ব্যাংক একাউন্টে লাখ লাখ টাকা। ফারিয়ার একাউন্ট তো সাহারা মরুভূমি। সহায় সম্বলহীন কোনো মেয়ের জন্য ঢাকা শহর যে কী পরিমাণ নির্মম হতে পারে সেটা অনুমান করাও হয়তো মার পক্ষে সম্ভব না। নয়তো তাকে বারবার বিকাশে টাকা পাঠানোর তাগিদ দিত না। কোত্থেকে টাকা পাঠাবে সে। চাকরি নেই। একটা পয়সা সঞ্চয় নেই। ব্যাংক একাউন্ট বলে যে জগৎ সংসারে একটা পদার্থ আছে তাও একরকম ভুলতে বসেছে। মাঝে একবার গিয়েছিল অ্যাকাউন্টস ব্যালান্স চেক করতে। তার হিসেবে, অন্তত হাজার দুই টাকা তো থাকার কথা। বুথে গিয়ে ব্যালান্স চেক করে দেখল এক পয়সাও নাই। কাস্টমার কেয়ারে ফোন করলে বলে ৭৭৭৭ নম্বরে ডায়াল করুন। সেইখানে ডায়াল করলে আবার কিছুক্ষণ ঝিঁঝি পোকার আওয়াজের মতো একটা শব্দ হয়। তারপর সব চুপচাপ। একবার ভাবল চুলোয় যাকগে। আর খোঁজ নেবে না। কিন্তু দুই হাজার টাকাকে উপেক্ষা করার দৃঢ়তা দু’দিনও দেখাতে পারার জো নেই তার। আধ মাইল হেঁটে, সরাসরি ব্যাংকে গিয়ে, আধ ঘণ্টা বসে থেকে, নির্ধারিত টোকেন নেয়ার পর ব্যাংক জানাল কার্ড ব্যবহারের সুবাদে ওই দু’হাজার টাকা কাটা গেছে তার। ফারিয়ার মনে হল, কে যেন পেরেক দিয়ে চেয়ারের সঙ্গে ঠুঁকে রেখেছে তাকে। ওঠার শক্তি নাই। শক্তি থাকার কথাও নয়। ওই দু’হাজার টাকার আশাতেই এতদূর ছুটে আসা। তারচেয়ে বড় ব্যাপার ব্যাংকের এই ব্রাঞ্চটা তার সাবেক অফিসের একদম সামনে। এখান থেকে যেতে হলে তাকে যেতে হবে হেঁটে। পার্সে দশ টাকার নোটও নাই। হেঁটে যাওয়ার লম্বা সময়ের মধ্যে অফিসের পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। স্যান্ডেলের স্ট্র্যাপও যখন তখন ছেঁড়ার মুখে। তার যা কপাল! দেখা গেল আজগর সাহেব হৈ হৈ করে কলিগদের কয়েকজনকে নিয়ে ‘লাজিজা’য় লাঞ্চ করতে যাচ্ছে… অথবা সবাই মিলে ব্লকবাস্টারে সিনেমা দেখতে যাচ্ছে অথবা শুটিং ইউনিটের ক্যামেরার সামনে বাইরে দাঁড়িয়ে অফিসের কোনো ‘বাইট’ দিচ্ছে, সেই এক দঙ্গল লোকের সামনে ফারিয়ার স্যান্ডেল যাবে ছিঁড়ে…। সেই দৃশ্য ঠিক চোখে পড়বে আজগর সাহেবের অথবা হামিদ সাহেবের অথবা টুটুলের কিংবা আসিফের। আসিফ অবশ্য যার পর নাই ভদ্র। স্যান্ডেল ছেঁড়ার ব্যাপার সে যথাসম্ভব ভদ্র পথে মোকাবেলা করবে। কিন্তু আজগর সাহেবের বাস্তববুদ্ধি কম। যে কোনো বিষয়ে তার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হয় হৈ চৈ করে ওঠা। আরে ফারিয়া না? কী ব্যাপার, স্যান্ডেল ছিঁড়ল? আজকাল স্যান্ডেল কোম্পানিগুলাও হয়েছে যেমন… টুটাফাটা পলকা স্যান্ডেল বানানোয় ওস্তাদ। ছিল আমাদের সময়কার শ্রী লেদার্স। একবার কিনলে টানা দশ বছর নিশ্চিন্ত। সামনে অবশ্য বিরাট শপিং মল। চলেন, স্যান্ডেল কিনে আসি। স্যান্ডেলের মতো সামান্য জিনিস কিনতেও তার একটা হৈ চৈ দরকার। উফ! তার ব্যাগে স্যান্ডেল কেনার পয়সা পর্যন্ত নাই। ভাবতে গেলেই বরফের মতো জমে আসে শরীর। লজ্জায়-ঘৃণায় অপমানে। অসহ্য এই জীবন। এর চেয়ে ভালো ছিল আধমরা কোনো ফড়িং, ডানা ভাঙা কোনো দাঁড়কাক অথবা খাঁচায় বন্দি কোনো ইঁদুরের জীবন। নিজেকে তার বিবর্ণ মমির মতো মনে হয়। মমি মনে হলেও মমি হয়ে থাকার উপায় নাই। একটা মানুষ জীবন পেয়েছে। তার শেষটা দেখে যেতে হবে তো। নিজের জন্য না হলেও মায়ের জন্য। ভাইবোনদের জন্য। চাকরি না থাকলে বোনটাকে বিয়ে দিয়ে দিতে হবে যৌতুকপন্থী কোনো আড়তদারের কাছে। সে তার বোনটার পড়াশোনা বন্ধ করে দেবে। ঘর থেকে এক পা বের হতে দেবে না। দিনরাত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তুই-তোকারি করে বোনটাকে অপমানের চূড়ান্ত করে ছাড়বে। কে জানে এসব সহ্য করতে না পেরে বোনটা হয়তো গলায় দড়িই দিয়ে ফেলল… ভাইটা হয়তো মিশে যাবে খুচরো ইয়াবা বিক্রেতার সঙ্গে…। আর মা? নাহ্। এরপর আর ভাবা যায় না। ফারিয়া ঠিক করল বড় স্যারের কাছে যাবে। সামনেই তো অফিস। স্যান্ডেল ছিঁড়লে ছিঁড়বে। ব্যাগের মধ্যে সেপটিপিন তো আছে।
কিন্তু যাব ভাবা যত সহজ বড় স্যারদের কাছে পৌঁছানো ততটাই কঠিন। অফিস তো নয়, যেন পেন্টাগনের হেডকোয়ার্টার। কতরকম নিরাপত্তার অন্ধিসন্ধি যে পার হতে হয়! আছে পিএসদের রকমারি প্রশ্নের পাহাড়। কী, কেন, কখন, কীভাবে, এজেন্ডা কী…। তবু এসব ঝকমারি ধাপ অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত বড় স্যারের কাছে পৌঁছানো গেল। এত ঝক্কি। দম ফুরিয়ে আসছে তার। কত লোকের কত রকম বড় বড় প্রয়োজন। কতো লোক যে আসছে যাচ্ছে…। এরা কি অন্য গ্রহের জীব? আসছে যাচ্ছে, কার্পেট অমলিন। একফোঁটা ধুলোময়লার ছাপ পড়ছে না কার্পেটে। ফারিয়ার একবার মনে হল উঠে চলে যায়। দরকার নেই চাকরির। কিন্তু সেই মুহূর্তেই ডাক পড়ল। আশ্চর্য! খুব অন্য গ্রহের কিছু নয়। টেবিলের পাশে একটা হটপটও আছে দেখি। মিল্টন কোম্পানির। স্যারেরাও এসব কোম্পানির হটপট ব্যবহার করেন। টেবিলের ওপর খাবার। কলমি শাক, চাপিলা মাছ, টক দই… এসবও খান স্যারেরা? খেতে খেতেই কথা বলবেন স্যার? তার মতো সামান্য ফারিয়ার সঙ্গে? অবাক হওয়ার মতো ব্যাপারই বটে। কিন্তু না। অবাক হওয়ার আরও বাকি ছিল কিছু। বড় স্যার নিজের মুখে বলছেন, কী ব্যাপার ফারিয়া, আপনাকে চাকরিতে রি-জয়েনের লেটার পাঠানোর পরেও আপনি জয়েন করেননি কেন? সমস্যা কী? অফিসে আপনার যে অ্যাড্রেস ছিল সে অ্যাড্রেসেই পাঠানো হয়েছিল। পেয়েছেন তো? উত্তেজনায় ফারিয়ার প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড়। অতিরিক্ত নার্ভাসনেসের কারণে এটা বলাও তার পক্ষে সম্ভব হল না যে আগের বাসা কবেই বদলে গেছে। চাকরি যাওয়ার পর থেকে তো সে বান্ধবীদের বাড়িতে বাড়িতে ঘুরছে। যাযাবর, উদ্বাস্তুর মতো। আপনার ফোনেও তো মেসেজ পাঠানো হয়েছে। পাননি? স্যারকে অবশ্য এটাও বলা গেল না পুরনো নম্বরটা সে অফ রেখেছে পাওনাদারদের ভয়ে। নির্বাক ফারিয়া। কিন্তু স্যার তার দিকে তাকিয়ে আছেন উত্তরের আশায়।
লেখক : জয়া ফারহানা, কবি